কলমে – রাজা চট্টোপাধ্যায়
আমি যখন স্কুলের গন্ডি পেরিয়ে কলেজে, তখনও আমার দিল্লি দর্শন না হওয়ায়, দেশের রাজধানী সম্পর্কে আমার ধারণা ছিল বেশ অন্যরকম। সেই সময় সংবাদপত্রের পাতায় এবং টিভির পর্দায় আমাদের রাজধানী সম্পর্কে যেটুকু তথ্য পেতাম, তখন ধারণা হয়েছিল, দিল্লি মানেই শুধু রাজনীতি, প্রশাসন, ইতিহাস আর ক্ষমতার অলিন্দ। এরপর কর্মসূত্রে দিল্লি শহরে পা রেখে, এই শহরকে আপন করে নিয়ে, আমার ধারণা অনেকটাই বদলে গিয়েছিলো। দিল্লিতে সারাবছর জুড়ে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের স্বাদ গ্রহণের পাশাপাশি, যখন হিমের পরশ অনুভবে শরৎকালের মুখোমুখি হয়েছিলাম, তখন ঢাকের বাদ্যি, ধূপের গন্ধ, শিউলির সুবাস আর বাংলার গান-আড্ডায়, আমার অচেনা রাজধানীর মুখ যেন এক টুকরো বাংলার প্রতিচ্ছবি রূপে ধরা দিয়েছিলো আমার মননে। এই শহরের দুর্গাপূজার সম্পর্কে অনুসন্ধানে জেনেছিলাম, ১৮৪২ সালে ব্যক্তিগত উদ্যোগে দিল্লিতে প্রথম দুর্গাপূজার আয়োজন করা হয়েছিল।ঐতিহাসিক সূত্র অনুযায়ী, এর প্রায় সাত দশক পরে, দিল্লি দুর্গাপূজা চ্যারিটেবল অ্যান্ড কালচারাল সমিতির উদ্যোগে, ১৯১০ সালে রোশনপুরা কালীমন্দিরে, দিল্লির প্রথম উল্লেখযোগ্য বারোয়ারি বা কমিউনিটি দুর্গাপূজা হয়েছিল এবং ১৯১২ সালে সেটি স্থানান্তরিত হয়েছিল লক্ষ্মীনারায়ণ ধর্মশালায়। এরপর ১৯৫৮ থেকে ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত মাদ্রাসা রোডের উইমেন্স পলিটেকনিক, প্রাঙ্গণে এই পূজা অনুষ্ঠিত হয়ে, ১৯৬৮ সাল থেকে পাকাপাকি ভাবে বেঙ্গলি সিনিয়র স্কুল প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হয়ে চলেছে। দিল্লির প্রাচীনতম ও একমাত্র হেরিটেজ দুর্গাপূজা মণ্ডপ হিসাবে, এই পূজা আজ কাশ্মীরি গেটের পূজা নামে রাজধানীতে সুপরিচিত।
নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা যায়, এই পূজা মণ্ডপে একসময় বহু বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের গৌরবময় উপস্থিতি ঘটেছিল। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, প্রমথেশ বড়ুয়া এবং শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী প্রমুখ। তাঁদের আগমনের স্মৃতি এই পূজার ঐতিহ্য ও ঐতিহাসিক গুরুত্বকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। এই পূজার হীরক জয়ন্তী উদ্যাপন অত্যন্ত মর্যাদা ও জাঁকজমকের সঙ্গে পালিত হওয়ার পর, ২০০৯ সালে শতবর্ষ উদ্যাপনও গভীর উৎসাহ ও ঐতিহ্যের আবহে সুসম্পন্ন হয়েছিল। শুরুর দিকে কাশ্মীরি গেটের এই পূজা, ‘ঘট’কেই দেবীর প্রতীক রূপে আরাধনা করলেও, ১৯১২ সাল থেকে এখানে দেবীকে প্রতিমা রূপে পূজা করা শুরু হয়। তবে ১৯২৫ সাল পর্যন্ত, কলকাতা থেকেই প্রতিমা নিয়ে আসা হলেও, ১৯২৬ সাল থেকে কলকাতার মৃৎশিল্পী এসে দিল্লিতেই প্রতিমা নির্মাণ শুরু করে। প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য, এই পূজার প্রতিমা প্রথম থেকেই একচালা ও ডাকের সাজে নির্মিত হয়ে এলেও, শুধুমাত্র ১৯৪৮ সালে প্রতিমাশিল্পী দিল্লিতে আসতে না পারায়, সেই বছর কলেজ অফ আর্টের ছাত্রছাত্রী ও শিক্ষকদের সহায়তায় প্রতিমা নির্মিত হয়েছিল।তবে সেবার মা দুর্গা ও তাঁর সন্তানদের আলাদা আলাদা চালচিত্রে নির্মাণ করা হলেও, দর্শকদের কাছে সেটা বিশেষ পছন্দের ছিল না। তাই পরবর্তীকালে আবারও একচালা ডাকের সাজের ঐতিহ্যই বজায় রাখা হয়। ১৯৫১ সালে এই পূজা কমিটির উদ্যোগে ঢাক কিনে প্রথমবার এই পূজায় ঢাক বাজানো শুরু হয়। তখন পূজা কমিটির সদস্যরাই এই ঢাক বাজাতেন এবং ১৯৬৮ সাল থেকে কলকাতা থেকে পেশাদার ঢাকিরা আসতে শুরু করেন।
দিল্লি দুর্গাপূজা চ্যারিটেবল অ্যান্ড কালচারাল সমিতির উদ্যোগে, এই কাশ্মীরি গেটের পূজা, ১৯৬৬ সালে শ্রেষ্ঠ প্রতিমার পুরস্কার পাওয়ার পর থেকে, কমিটির তরফ থেকে আর কখনও শ্রেষ্ঠ প্রতিমার প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া না হলেও, গত ২০২৪ সালে এই পূজা কমিটির এক উৎসাহী যুবকের তৎপরতায়, “নারায়ণী নমস্তুতে গ্লোবাল দুর্গাপূজা এক্সেলেন্স অ্যাওয়ার্ডস কমিটি” আয়োজিত প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছিল। এবং সেই বছর এই পূজা বাংলার সীমানার বাইরে শ্রেষ্ঠ জাতীয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য পুরস্কার অর্জন করেছিল। রাজধানী দিল্লির এই প্রাচীন পূজা কমিটির আরও একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো, সময়ের স্রোতে পরিবহণ ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন হলেও, প্রতিমা নিরঞ্জনের প্রাচীন রীতিকে সম্মান জানিয়ে বিগত ১৯১৩ সাল থেকে আজও গরুর গাড়িতে করেই এই পূজার প্রতিমা নিরঞ্জন করা হয়। তাই শুধু প্রাচীনত্বের কারণেই নয়, রাজধানী দিল্লির প্রাণকেন্দ্রে আয়োজিত কাশ্মীরি গেটের এই পূজাটি বাংলার লোকসংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে ধারণ ও উদযাপনের ক্ষেত্রে এক অনন্য নজির স্থাপন করেছে।
রাজা চট্টোপাধ্যায় | Raja Chatterjee
৩১.০৮.২০২৬







